তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০১৮, বৃহস্পতিবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

লাশ কাটা ঘর

লাশ কাটা ঘর
[ভালুকা ডট কম : ২০ মে]
রাজধানীর পিচঢালা কালো পথ ধরে ছুটছে অনেকেই। সবারই একটা ঠিকানা আছে। ঠিকানা নেই ওদের দু'জনের। ওরা গন্তব্যহীন গন্তব্যে ছুটে চলছে।পাঁচ মাসের ঘরভাড়া বকেয়া পরিশোধ করতে না পারায় বাড়ীওয়ালা আজ সকালে ওদের তাড়িয়ে দিয়েছে। তালতলা বস্তিতে একটি খুপড়ির মতো ঘরে ভাড়া থাকত ওরা। বাড়ীওয়ালাকে কত করে বলেছে আকবর আলী, পৌষ মাসের এই হাড় কাঁপানো শীতে ছয় মাসের অন্ত:সত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে কোথায় যাবে সে...। একটু রহম করার জন্য বাড়ীওয়ালার পা ধরে কতই না কান্নাকাটি করলো ওরা। বাড়ীওয়ালার রহম হল না।হাঁটতে হাঁটতে ওরা চিড়িয়াখানার সামনে এসে দাঁড়ায়। চল্লিশার্ধো আকবর আলীর স্ত্রী কমলা খাতুনের মুখে হতাশার কোন ছাপ নেই। তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেনো সে ঘুরতে বেরিয়েছে।রাজধানীর শত শত আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকার ভিড়ে এমনকি দুর্গন্ধময় বস্তির মাঝেও ওদের মাথা খোঁজার ঠাঁইটুকু নেই। গ্রামে ফিরে যাবে সেই সুযোগও নেই। আড়িয়াল খাঁ নদী সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।এমন পরিস্থিতিতেও কমলা খাতুনের আবদার, আপনে না একদিন কইছলাইন আমারে চিড়িয়াখানা দেহাইবাইন। আজগা লইন দ্যাহি।
: তর আসলে মাইট্টা কইলজা নাই। ইমুন অবস্থায় তুই আজগা চিড়িয়াখানা দেহুনের কতা ক্যামনে কইলি?
: ক্যামনে কইলাম? মনডা চায়ছে হের লাইগগা কইলাম। এ্যাই লইন কুড়ি ট্যাহা, দুইডা টিকেট কাইটটা লইয়াইন।
চিড়িয়াখানা দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে যায়। ক্লান্ত শরীর নিয়ে ওরা বানরের খাঁচার সামনে বসে বাদাম খায়। কমলার কাছে বানরের লাফালাফি খুব ভাল লেগেছে। তাই বানরগুলোকে শেষ বারের মত দেখে নিচ্ছে কমলা। এভাবে সবগুলো জীবজন্তু দর্শনেই কমলার চোখে মুখে ছিল বিস্ময় আর আনন্দ। কিন্তু আকবর আলীর কমলার মত কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়নি। তার কেবলি মনে হয়েছিল এসব জীবজন্তুর চেয়ে বরং সে নিজেই আজব এক প্রাণী। তার ঘর নেই, বাড়ী নেই। জঙ্গলে বাস করার বিধান নেই। জেলখানায় বাস করার মতো অপরাধ নেই। এমনকি জীব জানোয়ারের মতো চিড়িয়াখানায় বাস করবে সেই সুযোগও নেই।
চিড়িয়াখানা দারোয়ান বাঁশি বাজাচ্ছে। চিড়িয়াখানা দেখার সময় ফুরিয়ে এসেছে। দর্শনার্থীদেরকে চলে যাওয়ার জন্য দারোয়ান বাঁিশ বাজাচ্ছে।
কমলা বিষয়টি বুঝতে পেরে তার স্বামীকে বললো, এ্যাই লইন উইটটা পড়ি। চিড়িয়াখানা দেহুনোর টাইম শেষ অইয়া গ্যাছে গা।
: আকবর আলী নিরুত্তর। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বানরগুলির দিকে।
: কমলা এবার কিছুটা রাগ্বত সুরে বলল, উডুইন্না কেরে হুনতাছুইন্ন টাইম শেষ।
: হ, হুনছি। কমলা...
: হু।
: কই যাইবামরে কমলা?
: আল্লাহর দুইন্নাডা অনেক বড়-লইন-উডি। একটা উপায় একবা না একবা অইবঅই অইব।
: কমলা, দ্যাখ-দ্যাখ, বান্দরগুলো কি ছুন্দর কইরা যার যার ঘরে যাইতাছেগা। আমি যদি বান্দর অইতামরে কমলা,ত-অ ভালা আছিন। চিড়িয়াখানাত আশ্রয় পাইতাম।
: আর আমি বুঝি অইতাম বান্দরনি। থুবাস থুবাস! কি পাগল-ছাগলের মতন কতা কইতাছুইন। কমলা কিশোরী মেয়ের মতো হাসতে লাগলো।
সহাস্যে আকবর আলী বলল, হাসলে তরে জবর ছুন্দর লাগেরে কমলা-জবর ছুন্দর লাগে। জানছ কমলা মানুষ সৃষ্টির সেরা এই কারনে যে, আমডা হাসতাম পারি বইল্লা। দুইন্নার আর কুনু জীব হাসতে পারে না। চিড়িয়াখানাত কত কিসিমের জীব-জানোয়ারইনা দ্যাখলাম কই কেউরে হাসত দ্যাখছস?
: হ, হাছাইত। বাঘ, ভাল্গুক, হাতি, ঘোড়া, হাপ কেউরেত হাসতে দ্যাখলাম না। জবর দামি কতাডাত কইছুইনগো। কইত্তে হুনলাইনগো কতাডা?
হঠাৎ চিৎকার করে উঠে কমলা। পেটের ব্যাথাটা শুরু হয়ে গেছে। কমলা একেতো দীর্ঘদিনের গ্যাস্টিকের রোগী দ্বিতীয়ত: অন্ত:স্বত্ত্বা। ব্যাথাটা ক্রমেই বাড়ছে। ডাক্তার আরো তিন মাস পূর্বেই বলেছিল, কমলার ষ্টোমাকে আলসার হয়ে গেছে। জরুরী ভিত্তিতে তাকে অপারেশন করাতে হবে। দিন মজুর আকবর আলীর পক্ষে বিশ হাজার টাকা যোগাড় করা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না বলে আজো অপারেশন করা হয়নি কমলার।
আকবর আলী কমলাকে নিয়ে একটা রিঙ্ায় উঠে। রিঙ্া ছুটে চলেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে। পঞ্চাশোর্ধ বৃদ্ধ রিঙ্াওয়ালা সর্বশক্তি দিয়ে প্যাডেলে চাপ দিচ্ছে। কমলার চিৎকারের শব্দে রিঙ্াই যেনো হয়ে উঠেছে এ্যাম্বুলেন্স। এক জীবন্ত এ্যাম্বুলেন্স। শ্যামলীতে পেঁৗছার পর রিঙ্া পড়ে গেল ট্রাফিক জামে। শত শত যানবাহন থামিয়ে থামিয়ে দিয়েছে ট্রাফিক সার্জেন্ট। পাশের রাস্তা দিয়ে মন্ত্রী যাবেন। মন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য জনসাধারণের যানবাহন চলাচাল বন্ধ রাখা হয়েছে। বিষয়টি জানার পর চেচিয়ে উঠে কমলার রিঙ্াওয়ালা। রাগে ক্ষোভে সে চিৎকার করে বলতে লাগলো, মাগার আমাগো দেশ নাকি গণতান্ত্রিক। হালায় গণতন্ত্র থাকলে রাস্তা বন্ধ করে ক্যামতে? মাইয়্যাটা পেটের ব্যাথায় চিক্কুর পাইরা মরতাছে-কেউ হুনবার লাগছে না। মন্ত্রীর নিরাপত্তা আছে, আমাগো নিরাপত্তা নাই? আমরা কি হালায় কুত্তা বিলাই নাকি?
নিরুপায় হয়ে পথিমধ্যে কমলাকে নিয়ে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে যাওয়া হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। ওরা বলল, যাও যাও ঢাকা মেডিকেলে যাও।
অবশেষে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে পৌছতে পৌছতে অনেক রাত হয়ে যায়। জরুরী বিভাগের বারান্দায় পড়ে আছে কমলা। কমলা ব্যাথায় হাউমাউ করে কাঁদছে, তবুও কেউ এগিয়ে আসছে না। আকবর আলী ভেতরে গেলে কম্পাউন্ডার তাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে। ডাক্তার সাহেব ক্যান্টিন থেকে এলে আকবর আলীকে ডাকা হবে বলে জানায় কম্পাউন্ডার।
আকবর আলী বিভিন্ন দোয়া দরুদ পড়ে কমলার গায়ে ফু দিতে লাগলো। ভুলে ভরা এই দুরুদ পড়তে দেখে দু:ষহ ব্যাথার মধ্যেও কমলা হি হি করে হেসে উঠে। আকবর আলী কমলার হাসি দেখে শিশুর মত কেঁদে উঠে।
: কমলা তুই একটা আজগুবী মাইয়্যারে-আজবগুবী একটা মাইয়্যা। মরনের সময় অ তুই হাসছ।
: হ ঠিকঅই কইছুইন। আমার সময় শেষ। আমারে বিদায় দেইন। আপনারে কত কতা কইছি, কত জ্বালাইছি-আমারে ক্ষ্যামা দেইন। অরে আল্লারে, অরে মাইয়্যারে...।
: না কমলা না, এ্যাই কতা কইছ না। তরে আমি মরুনের লাইগগা দিতাম না। ডাকতর অহনেঅই আইয়া পড়ব।
: ডাক্তার আইলে আর কি অইব? অপারেশনের অত ট্যাহা আপনে কই পাইবেন? অরে আল্লাগো...।
: ট্যাহার কতা তুই কুনু চিন্তা করিছ না। আমার লক্ত বেইচ্ছা তর অপারেশনের ট্যাহা বাউ করবাম।
স্বামীর একথায় কমলা এবার বেশ শব্দ করে হাসতে লাগলো। কমলার দু\'চোখে শ্রাবনের বৃষ্টি, ঠোঁটে তার হাসি। এই দৃশ্য দেখে আকবর আলীর বুকটা হু হু করে উঠে।
আকবর আলী ছুটে যায় দোকানে। খাবার সোডা খেলে কমলার পেটের ব্যাথাটা কিছু কমে। অনেক খোঁজাখোঁজির পর এক পুটলা সোডা এনে দেখে কমলার চারপাশে মানুষের ভীড়। কমলার কান্নার কোন শব্দ নেই। নেই হাসির শব্দও। আকবর আলীর পা আর সামনে এগুচ্ছে না। কমলার লাশের কাছে যাওয়ার মত কেন যেন সাহস পাচ্ছে না সে।
রাত বাড়ার সাথে সাথে মানুষের জটলা কমতে শুরু করে। এক সময় জনশূন্য হয়ে পড়ে হাসপাতালের বারান্দা। বারান্দায় শুধু পড়ে রয়েছে কমলার নিথর দেহ। লাশের দিকে লাল পিঁপড়ার দল লাইন বাঁধতে শুরু করেছে। বিচ্ছিন্ন ভাবে কয়টা তেলাপোকা লাশের উপর দিয়ে হাঁটছে। কমলার মুখের উপর একশো পাওয়ারের এটি বাতি ঝুলছে। বাতির আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কমলাকে। মৃত কমলাকে এখন কেমন যেন এক অদ্ভুত ধরনের সুন্দর লাগছে। হাসিটি এখনো ফুটে আছে তার ঠোঁটে।
আকবর আলী কিছুতেই সাহস পাচ্ছে না কমলার লাশের কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর। লাশ বহনের গাড়ি ভাড়ার টাকা নেই তার কাছে। এছাড়া লাশ নিয়ে রাখার মত ঠিকানাও নেই তার। লাশের পরিচয় দিলেই তাকে লাশটি বহন করতে হবে। সেই জন্য আকবর আলী ভিন্ন এক দর্শকের মত দূরে দাঁড়িয়ে আছে। রাত যতই বাড়ছে শীত ততই ঝাকিয়ে আসছে। কুয়াশায় ডেকে দিচ্ছে সব। কুয়াশা আকবর আলীকে লুকাতেও সাহায্য করছে।
গভীর রাতেও যখন লাশের পরিচয় এবং সাথের কাউকে পাওয়া গেল না তখন হাসপাতালের কতর্ৃপক্ষ লাশটি বেওয়ারিশ হিসেবে লাশ কাটা ঘরে পাঠিয়ে দেয়। কমলার লাশ কেটে সকালে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা প্র্যাকটিকেল একটা ক্লাশ করবে। তারপর লাশটি আঞ্জুমানে মফিদুলে দিয়ে দেওয়া হবে।
বিষয়টি জানতে পেরে আকবর আলী হাসে আর বিড় বিড় করে বলতে লাগলো, তর কি ভাগ্যরে কমলা। তর লাশ কাইটটা ছাত্ররা ডাক্তারি হিকব। তুই কি ছুন্দর একটা ঘরঅ আশ্রয় পায়ছসরে কমলা-তর কি ভাগ্য--।
আকবর আলীর এ কথাগুলো শুনে ফেলেন জরুরী বিভাগে পরিদর্শনে আগত প্রফেসর ডা: মোয়াজ্জেম হোসেন।
: মহিলার লাশটি কি তোমার?
: চমকে উঠে আকবর আলী। মৃদুমাথা ঝাঁকিয়ে সে এর সত্যতা স্বীকার করে নিলো।
: লাশটি কি হয় তোমার?
: আমার বউ-বউ স্যার বলেই ঢুকরে কেঁদে উঠে আকবর আলী।
: শুনেছি লাশটি দীর্ঘক্ষন ধরে বারান্দায় পড়েছিল। তুমি এতোক্ষণ পরিচয় দাওনি কেন?
: স্যার আমার কাছে লাশটা নিওনের গাড়ি ভাড়ার ট্যাহা নাই।
: কি বলছো তুমি! লাশ নেওয়ার মত ক'টা টাকা নেই তোমার কাছে?
: হ স্যার। হাছা কতাঅই কইতাছি। লক্ত বেচতাম গেছলাম। আমার লক্ত বলে ভালা না। কি জানি একটা দোষ আছে। হের লাইগগা আর লক্ত বেইচতাম পারলাম না। লক্ত বেচতারলে কমলারে আমি এইহানে ফালাইয়া রাখতাম না, কিছুতেই না।
: আচ্ছা ঠিক আছে, গাড়ী ভাড়ার টাকা আমি দিচ্ছি-তুমি লাশটি নিয়ে বাড়ী যাও। এসো আমার সাথে এসো আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
: বাড়ি ঘরঅ নাই স্যার। লাশ নিয়া কই রাখবাম? হুনছি কমলার লাশ কাইটটা ছাত্ররা ডাক্তারী হিকব। একটা দীর্ঘনি:শ্বাস ছেড়ে প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন বললেন, হঁ্যা তোমাদের মত গরীব মানুষের লাশ কেটেই আমরা ডাক্তারী শিখি। ধনী মানুষের লাশ কাটার সুযোগ আমরা কখনোই পাই না। অথচ সেই তোমরাই বিনা চিকিৎসায় মারা যাও। তোমাদের জন্য আমরা কিছুই করি না। আমরা ব্যস্ত ধনী মানুষদের জন্য। আমরা টাকার মোহে অধিকাংশ চিকিৎসকই আজ অন্ধ হয়ে গেছি। আমাদের মতো এ জাতীয় চিকিৎসকদেরকে তোমরা কখনো ক্ষমা করো না। কখনো না।

লোহাজুরী ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে লোকে লোকারন্য। আজ রইব্যা চোরের শক্ত বিচার করা হবে। কুদ্দুছ মন্ডলের গাছ থেকে গত রাতে রইব্যা কাঁঠাল চুরির সময় হাতে নাতে ধরা পড়েছে। গত পরশুও হাছেন বেপারীর বাড়িতে মুরগী চুরি হয়েছে। প্রতি রাতেই কোন না কোন বাড়ীতে এটা সেটা চুরি হচ্ছেই। ইতিপূর্বে রইব্যা চোর বহুবার ধরা পড়েছে। গ্রাম্য সালিশে তাকে পিটুনিসহ কানে ধরে উঠ-বোস ও নাকে খঁত দেওয়ানো হয়েছে। তবুও তার স্বভাব পরিবর্তন হচ্ছে না। তার অত্যাচারে গ্রামের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। কাজেই আজ তাকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে। লোকজন অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় বসে আছে চেয়ারম্যান সাহেবের জন্য। চেয়ারম্যান এলেই বিচার কাজ শুরু হবে।

মাঠে সবার মাঝখানে রইব্যা চোরকে একটা খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়েছে। রইব্যা মাটিতে চুপ করে বসে আছে। ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে সে কখনো চোখ ঘুরিয়ে মানুষ দেখছে; আবার উদাস দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকছে। চুরি জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় রইব্যার কাছে বষর্াকালে চুরি করা নিরাপদ একটি সময়। এ সময় মানুষজন সহজে বাড়ীর বাইরে বের হয় না। কিন্তু আজ ঘটলো এর ব্যতিক্রম। আসলে 'চোরের দশদিন-গেরস্থের একদিন' প্রবাদটির সত্যতা যথার্থই। সে বুঝতে পারছেনা, আজ তাকে কি এমন কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে।
আছরের নামাজ পড়ে চেয়ারম্যান সাখাওয়াত হোসেন সালিশে উপস্থিত হলেন। চেয়ারম্যানকে দেখে লোকজন সবাই উঠে দাঁড়িয়ে ছালাম জানালো। চেয়ারম্যান লক্ষ্য করলেন, রইব্যা তাকে দেখে দাঁড়ায়নি এবং ছালামও দেয়নি।
ঃ কিরে রইব্যা, বেহায়া দাগী চোরতো অইলে অই, আবার তো দ্যাহি বেয়াদ্দপও অইয়া গেছস। সবাই আমারে দেইখ্খা খাড়াইলো আর তুইতো দ্যাহি বইয়া রইছস।
রইব্যা চোর নিরুত্তর।
চেয়ারম্যান এবার হুংকার দিয়ে বলে উঠলেন, অই কুত্তার বাচ্চা, কতা কসনা কেরে?
রইব্যা চোর কেঁপে উঠলো। চেয়ারম্যান সাব...।
এ সময় সিরাজ মেম্বার চেঁচিয়ে উঠে বললো, এ্যাই হারামজাদা, ছার ক ছার।
ঃ ছার, খুডির লগে আমার হাতও বান্দা, পাউও বান্দা, উইটটা কেমনে খাড়ইবাম।
চেয়ারম্যান হু বলে চেয়ারে বসলেন। নতুন প্যাকেট খুলে একটা বেনসন সিগারেট ধরালেন। আয়েশ করে কিছুক্ষন ধুঁয়া টেনে সিগারেটের অবশিষ্ট অংশটি রইব্যা চোরের উপর ছুঁড়ে মারলেন। রইব্যা সঙ্গে সঙ্গে ওহ্ আহ্ করে চিৎকার শুরু করলো। এ দৃশ্যে চেয়ারম্যানসহ সবাই হা-হা-হা শব্দ করে হেসে উঠলো। একটু পর পাবলিকের কাছ থেকেও পাঁচ-সাতটা বিড়ির অবশিষ্ট অংশ এসে পড়লো রইব্যা চোরের উপর। রইব্যা এবার হাউমাউ করে চিৎকার শুরু করলো।
চেয়ারম্যান সাহেব পাবলিকের উদ্দেশ্যে কড়া একটা ধমক দিলেন।
ঃ কি করতাছেন আপনারা! মানবাধিকার লংঘন কইরেন না। আপনেরা আমারে ভোট দিয়া চেয়ারম্যান বানাইয়াছেন। আমি এই গেরামের বিচারক। যা করনের আমি করবাম।
চেয়ারম্যান সাহেব রইব্যা চোর সম্পর্কে গ্রামবাসীর অভিযোগ মনযোগ দিয়ে শুনলেন। গত রাতে কুদ্দুছ মন্ডলের গাছে কাঁঠাল চুরির সময় হাতে-নাতে ধরার কাহিনীও শুনলেন।
চেয়ারম্যান আরেকটা সিগারেট ধরালেন। কয়েকটা টান দিয়ে তা রইব্যা চোরের উপর ফের ছুঁড়ে মারলেন। রইব্যা এখন আর ওহ্ও করলো না আহ্ও করলো না। মনে হয় এটা তার সয়ে গেছে।
চেয়ারম্যান বিচারের রায় ঘোষনা করলেন :
'রইব্যার মাথা কামিয়ে গলায় জুতার মালা পড়িয়ে তাকে বাজারে ঘুরানো হোক। অত:পর তার দুই হাতের দুই আঙ্গুলে দুইটা দশ নম্বর সুঁই ঢুকিয়ে দেওয়া হোক।'
রায় ঘোষনার পর শাস্তির প্রথম পর্বটি উৎসব আমেজে সমাধা করলো লোকজন। এখন শাস্তি প্রদানের দ্বিতীয় পর্ব।
রাত দশটা বাজে। হ্যাজাক বাতি জ্বালানো হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে এখন মানুষের উপস্থিতি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। দশ নম্বর সুঁই আনা হয়েছে। কিন্তু সুঁই ঢুকানোর জন্য সাহসী একজন লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। লোক খোঁজা হচ্ছে। রইব্যা চোর মনে মনে আল্লাহকে ডাকছে আর বলছে, 'মাবুদগো, আজগা যদি আমারে এই সুঁইয়ের আজাব থাইক্কা রক্ষা কর, তাইলে আমি আর কোনদিন চুরি করতাম না। মাবুদগো, সুঁই ঢুকাইবার লাইগ্গা এই রহম আজরাইল মানুষ যাতে খুঁইজ্জা না পায়।

রইব্যা চোরের প্রার্থনা আল্লাহ শুনেননি। লোক খুঁজে পাওয়া গেছে। পূর্ব পাড়ার দবির উদ্দিন চকিদারের পুত্র খবির উদ্দিন ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসেছে। খবির উদ্দিন পুলিশের নামকরা দারোগা। বিশ বছরের চাকরি জীবনে বহু চোর-ডাকাতকে পিটিয়েছেন তিনি। তিন ডাকাতকে হাজতখানায় পিটিয়ে হত্যা করার অভিজ্ঞতাও তার রয়েছে। পত্রিকায় নেতা পেটানোর ছবি বেশ ক'বার প্রকাশ হয়েছে। খবির দারোগা ঘটনাস্থলে এসে চেয়ারম্যানকে বললেন, এতো দূর্বল মন লইয়া চেয়ারম্যানগিরি কেমনে করবেন? দেন সুঁই দেন।
খবির দারোগা রইব্যা চোরের আঙ্গুলে সুঁই ঢুকানোয় বেশ দক্ষতার পরিচয় দিলেন। রইব্যা 'ওরে মায়াগো ওরে বাবাগো' বলে আকাশ কাঁপানো শব্দে চিৎকার করে উঠলো। তার এই গগনবিদারী চিৎকার শতাধিক মানুষের আনন্দ উল্লাস আর চেঁচামেচিতে হারিয়ে গেল। ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে শতবষর্ী বটবৃক্ষ লক্ষ্য করল, রইব্যা চোরের বুকফাটা চিৎকারের চেয়ে নির্দয় মানুষগুলোর উল্লাসের চিৎকারটিই প্রাধান্য পেল বেশি।
লোকজন আস্তে আস্তে করে যার যার বাড়ি ফিরতে লাগলো। কিছুক্ষন পর ইউনিয়ন পরিষদ মাঠ ফাকা হয়ে গেল। হ্যাজাক বাতি আর নেই।
অন্ধকারে পড়ে আছে রইব্যা চোর। রইব্যা নিজেই দাঁত দিয়ে কামড়ে সুঁই দুইটা উঠালো। আঙ্গুল দিয়ে তীরের গতিতে রক্ত ছুটছে। দূর্বা ঘাস চিবিয়ে আঙ্গুলে চেপে ধরার পর রক্ত পড়া কিছুটা বন্ধ হলো। ব্যাথাটা কমছে না। ক্ষুধাও লেগেছে প্রচন্ড। কঠিন এক যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে সে। গভীর ভয়ার্ত এই রাতে কেউ নেই তার পাশে। তবে ব্যাথা ও ক্ষুধা রইব্যাকে পাহারা দিয়ে রেখেছে। নতুবা নিস্তেজ হয়ে গেলে এতোক্ষনে তাকে শিয়াল-কুকুরে খেয়ে সর্বশেষ শাস্তির ব্যবস্থাটাও করে দিতো। 'ক্ষুধা মানুষকে যেমন মৃতু্যর দিকে ধাবিত করে-তেমনি কখনো কখনো বাঁচিয়েও রাখে।'
কাঁঠাল চুরির অপরাধে নির্মম শাস্তির শিকার আজকের রইব্যা কিছুদিন আগেও ছিল মোঃ রবি মিয়া। তার ঘরে গোলা ভরা ধান আর গোয়াল ভরা ছিল গরু। ছিল পুকুর ভরা মাছ। নদী ভাঙ্গন এবং মিথ্যা মামলার কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়ে যায় সে। অবশেষে নিরুপায় হয়ে চুরি পেশায় নামতে বাধ্য হয়। এরপর থেকেই তার নাম রবি মিয়া পাল্টে হয়ে যায়-রইব্যা। রইব্যা চোর।
রইব্যা উঠে দাঁড়ালো। শরীরটা থর থর করে কাঁপছে। পা টেনে টেনে বহু কষ্টে বাড়ি পৌছলো সে। বাড়ি এসে বউকে ডাকার সাহস পেলো না। চুপ করে বারান্দার এক কোনে বসে রইলো। আঙ্গুলের ব্যাথায় গোঙানীর একটা শব্দ হতে চায়ছে। কিন্তু তার স্ত্রীর বকাবকির ভয় থেকে বাঁচতে শব্দটা সে অতি কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। রইব্যা ভাবছে, কি ঘৃনীত তার এই চুরি পেশাটা। ঘরের বউও তাকে পছন্দ করে না। আবার সে একটা জিনিস ভেবে পায় না যে, সাখাওয়াত চেয়ারম্যানকে গত বছর পুলিশ রিলিফের এক ট্রাক গম চুরির অপরাধে থানায় ধরে নিয়ে গেল। অথচ একটু পরেই তাকে ছেড়ে দিলো। চেয়ারম্যানের আঙ্গুলে সুঁই ঢুকানো তো দূরের কথা, একদিনের জেলও তার হয়নি। তবে কি বড় চোরের বিচার নাই!
রইব্যা লক্ষ্য করলো, তার ছোট মেয়েটা এখনো ঘুমায়নি।
ঃ মায়া- মায়া, ও মায়া, বাজান অহনো আইয়ে না কেরে?
ঃ তর বাজানের আওনের টাইম অহনো অইছে না।
ঃ কোন সময় অইবো গো মায়া?
ঃ ফজরক্ত, ঘুমা হারামজাদী।
ঃ আমার লাইগগা আজগা যদি পুতুল না আনে বাজানের লগে আর কতা কইতাম না।
ঃ ও জাউরীর ঘরের জাউরী, চুপ করবি না চুল ধইরা দিতাম টান! ভাত খাওয়ানের মরদ নাই, হেয় আইন্না দিব তরে পুতলা? বেটারির পুতলা! চাবি দিলে কতা কয়-নাচে! অই হারামজাদী, জানছ এই পুতলার দাম কত?
ঃ কত ট্যাহা মায়া?
ঃ তরে বেচলেও এ্যাই ট্যাহা অইতো না।
ঃ তয় বাজানদি কইছে পুতুল আইজগা আইন্না দিব অই।
ঃ তর বাজান ত কত কতা অই ক। আমারে দুইডা লুপার চুড়ি বানাইয়া দিব কইছে হেই কবে.... অহনো দে অই। চোরের ঘরের চোর। রাইত পোআইলে ঈদ, চোরটার খবর নাই। মুখে দুহাত চেপে ধরে কাঁদতে লাগলো রইব্যার স্ত্রী মদিনা। মেয়েটা অন্ধকারেই ভাঙ্গা বেড়ার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে আছে পথের দিকে-কখন তার বাবা আসবে। নিয়ে আসবে পুতুল। এবারের ঈদে তাকে একটা বেটারির পুতুল কিনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তার বাবা।
পুতুল, রুপার চুড়ি, ঈদ-ঈদের বাজার, পুতুল.... শব্দগুলো রইব্যার বুকে বার বার ধাক্কা দিচ্ছে। ধাক্কার চোঁটে রইব্যা উঠে দাঁড়ালো। শরীরটা ঝাড়া দিয়ে আকাশের দিকে তাকালো সে। রাত পোহাতে আরো বেশ কিছু সময় এখনো বাকী আছে। টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়া শুরু হয়ে গেছে। গরুশূণ্য গোয়াল ঘরে লুকিয়ে রাখা ছোঁরা বের করে আনলো রইব্যা। চুরি জীবনে আজ এই প্রথম ছোঁরা কমরে গুঁজে সামনের দিকে হাঁটতে লাগলো সে......
লেখক/বার্তা প্রেরক- রহুল আমিন রাজু
কিশোরগঞ্জ






সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

সাহিত্য পাতা বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ৫৩৪ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই